টানা দুই বছর প্রেম করে অতি সম্প্রতি ছেকা খেয়ে বেকা হয়ে পরে আছি। দুনিয়ার কিছুই ভাল লাগে না। খালি নাই নাই লাগে। বন্ধু নেহাল আমায় নিয়ে বেজায় চিন্তায় পরে গেছে। ঠিক মত খাই না, নাই না শুধু কাইত-চিৎ হয়ে পরে থাকি আর ছেকা খাওয়া গান শুনি। তো বন্ধু নেহাল আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য সব ধরণের চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে ও ওর কিছু বান্ধবীকে আমার ফোন নম্বরও দিছে যাতে তারা আমায় একটু সান্তানা দিতে পারে । কিন্তু এখন আমার কোন মেয়ের কথা শুনলেই রাগের ঠেলায় সব তিতা তিতা লাগে।

কিন্তু আমার বন্ধু এত সহজে হারার পাত্র নয়।শেষমেশ বন্ধু আমাকে জোর করে ঘুরতে যেতে রাজি করাল। ঘুরলে মন এমনতেই ভাল হয়ে যায়। এই সময় নাকি আমার বেশি বেশি ঘোরাফেরা করা উচিৎ। তাই ওর বাবার কোন এক দূর সম্পর্কের চাচার বাড়ি আমাকে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করলো। জিজ্ঞেস করেছিলাম, পাহাড়-সমুদ্র রেখে গ্রামে নিয়ে যাচ্ছিস কেন। বন্ধু আমায় সাফ সাফ জানিয়ে দিল ও কোন রিস্ক নিতে পারবে না। কে জানে আবেগের ঠেলায় যদি ঝাপ মারি।

যাইহোক ওর দাদার বাড়ি যেতে যেতে রাত প্রায় এগারটা বেজে গেল। গ্রামের বাড়ি রাত এগারোটা মানে অনেক গভীর রাত। তার উপর শীতের দিন। একটা পোকাও মনে হয় জেগে নেই। রাত অনেক বলে কোন রকমে নাকে মুখে কিছু গুজে লেপের নিচে ঢুকে গেলাম। গ্রামে সত্যিই অনেক ঠাণ্ডা।

সকাল প্রায় সারে এগারটার দিকে ঘুম ভাংলো। তাও ভাংতো কিনা যদি না বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন না পরত। উঠে দেখি নেহাল হারামজাদা রুমে নাই। বাহিরে গিয়েও কোন খোঁজ পেলাম না। কি জ্বালা বাথরুমটা কোথায় কে জানে, ওদিকে সহ্য করাও যাচ্ছে না।এদিকে নেহালের বাবার চাচি মানে আমাদের দাদীমা আমার এই ছোক ছোক ভাব দেখে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, “কি নাতি, নেহালরে খুঁজো? ওত কিছুক্ষন আগে একটু ঘুরতে বাইর হইল।

”শালা আমারে বিপদে ফালাইয়া নিজে হাওয়া খাইতে গেছস । মনে মনে ওর পিন্ডি চটকাইয়া কাচুমাচু হয়ে দাদিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, “দাদিমা বাথরুমটা কোন দিকে?” দাদিমা এই কথা শুনে ফোকলা দাঁতে ভাঙ্গা হাসি দিয়ে বলল, “বেলা তো কম হয় নাই তোমার জন্যই তো অপেক্ষা করতাছি। আসো আমার লগে।”

আমিও নিষ্পাপ মনে তার পিছু নিলাম। কিন্তু বুঝলাম না সে আমায় কেন বারান্দার কোনায় রাখা চেয়ার টেবিলের দিকে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসতে বলল। এদিকে আমার ঘাম ছুটে যাচ্ছে, এত ফরমালেটির কি আছে বাথরুমটা দেখিয়ে দিলেই তো হয়।

যাই হোক, দাঁতে দাঁত চেপে বাসলাম কিন্তু একি দাদিমার হাতে দেখি খাবারের প্লেট আর মুখে সেই ভাঙ্গা মিষ্টি হাসি। কাম সারছে এরা কি ঘুম থেকে উঠেই আগে সকালের নাস্তা করে তারপর বাথরুমের কাজ সারে নাকি? আল্লাহ্‌ বাঁচাও আমায়। দাদিমা খাবারের প্লেটগুলো রাখতে রাখতে খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল, “এসব কিছু তোমাগো জন্যই বানাইছি। সব কিন্তু খাবা কইলাম, না করতে পারবানা।” আর মনে হয় ধরে রাখতে পারবো না। মনের আনাচে কানাচে আতিপাতি করে খুঁজেও কোন কিছু খাওয়ার বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছাকে খুঁজে পেলাম না। শেষবারে মত দাদিমাকে বললাম, “দাদিমা আমি আগে একটু বাথরুমে যাবো তারপর না হয় খাই।”

আমার কথা শুনে দাদিমার হাসি দেখি স্রুত করে মুছে গেল। তার বদলে সে ভীষণ করুণ মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “নাতি, এইটাই তো আমাগো ভাতরুম। এইখানেই আমরা খাই। শহরের মত তো আমাগো এত সুন্দর ব্যবস্থা নাই। কষ্ট কইরা এইখানেই খাও।”

ও আল্লাহ্‌ দাদিমা এসব কি কয়, নাকি আমার মাথাই পুরা আউলায় গেছে,কাজ করতেছে না। কি রেখে কি শুনি। উত্তাল সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে মৃত্যুর মুখে কেউ যখন কোন ভাঙ্গা জাহাজের টুকরো পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তেমনি ঠিক তখনই নেহালের আগমনে আমি ততটাই স্বস্তির শ্বাস ফেললাম।

এক দৌড়ে নেহালের কাছে গিয়ে বললাম, “তুই শালা আমায় তাড়াতাড়ি বাথরুমে নিয়ে যা, না হলে এখানেই কিন্তু ছেরে দেব।”

– “আরে চল চল, তো এটা দাদিমাকে আগে বলবি না। এতে লজ্জার কি আছে?”

– “তুই মর, আমি তো সেই কখন বলছি কিন্তু তোর সোহাগের দাদী বলছে এইটাই নাকি তাদের ভাতরুম আর এখানেই নাকি তারা খাওয়া দাওয়া করে। কোন দেশে আইলাম, তাড়াতাড়ি আমায় উদ্ধার কর বাপ।”

টিনের টয়লেটে ঢুকে চরম স্বস্তির সাথে খানিকটা শুনতে পেলাম নেহাল আর দাদিমা বাথরুম নিয়ে কি সব যেন বলতেছে।

কয়েকদিন ঘুরাফেরা করে মন সত্যিই অনেকটাই ভাল হয়ে গেছে। নেহালের আত্মীয়রা সবাই খুব সহজ সরল, খুবই ভাল। ওইদিনের সকালের ব্যাপারটা ছাড়া একয়দিন মনে হয় জামাই আদারে ছিলাম। যাইহোক আজ চলে যাচ্ছি। কিন্তু নেহালেকে দেখতে না পেয়ে রুম থেকে বাহিরে গিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ওকে খুঁজতে লাগলাম। ঠিক তখনই আমার উকি ঝুঁকি মারা দেখে দাদিমা কাছে এসে ফোকলা দাঁতে ভাঙ্গা হাসি দিয়ে বলল, “কি নাতি, নেহালরে খুঁজো? ওত বাতখানায় গেছে।”

বাতখানাটা আবার কোথায়, নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কোন জায়গা হবে। কই নেহাল তো আমারে একবারও নিয়ে গেল না। বেঈমানটা একা একাই গেল।দাদিমাকে জিজ্ঞেস করতে যাবো বাতখানাটা কোথায়, ঠিক তখনই দেখি আমার দোস্ত টিনের টয়লেট থেকে বের হচ্ছে। আর মিষ্টি দাদিমা মুখে ভাঙ্গা হাসিটা ধরে রেখেই বলল, “কিছু মনে কইরো না নাতি, তোমরা শহরের মানুষ যে পায়খানারে বাতখানা কও সেইটা আমি ধরতে পারি নাই। ওইদিন মেলা কষ্ট দিছি তোমারে, এরপর আবার যখন আসবা দেখবা আর ভুল হইব না।”

এদিকে দাদিমার কথা শুনে হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝতে না পেরে দাদিমার বাতখানার দিকে পা চালালাম।